রাজপথের সামনের সারির সেই নারীরা আজ কোথায়?

আন্দোলনের দিনগুলোতে নারীদের ভূমিকা শুধু সহায়ক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তারা ছিলেন অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি— অথচ সেই নারী নেতৃত্বই আজ ক্ষমতার বারান্দা থেকে হারিয়ে গেল।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্যানভাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় যে রঙের ছোঁয়া লেগেছিল, তা ছিল এ দেশের নারীদের দৃঢ় ও নির্ভীক উপস্থিতি।
রোকেয়া হলের তালা ভেঙে মেয়েদের রাজপথে নেমে আসা কিংবা পুলিশের ব্যারিকেড ও লাঠিসোটার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া—এই চিত্রগুলো কেবল সাহসের প্রতীকই ছিল না, বরং পুরো আন্দোলনকে এক অনিবার্য বিজয়ের মোহনায় নিয়ে গিয়েছিল। মিছিলের অগ্রভাগে স্লোগান দেওয়া থেকে শুরু করে আহতদের সেবা শুশ্রূষা, কিংবা ঘরে-বাইরে আশ্রয় নিশ্চিত করা—সবক্ষেত্রেই নারীরা ছিলেন সমানভাবে সরব।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, জুলাইয়ের রক্তঝরা দিনগুলো পেরিয়ে যখন রাষ্ট্র ও রাজনীতির পুনর্গঠনের সময় এলো, তখন রাজপথের সেই সাহসী মুখগুলো হঠাৎ করেই যেন ম্লান হয়ে গেল। অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারণের উচ্চকক্ষ—কোথাও মিলল না তাদের ন্যায্য ও দৃশ্যমান অংশগ্রহণ। রাজপথ কাঁপানো সেই নারী নেতৃত্ব আজ কেন ক্ষমতার বারান্দা থেকে হারিয়ে গেল, তা এক গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
রাজপথের চালিকাশক্তি
আন্দোলনের দিনগুলোতে নারীদের ভূমিকা শুধু সহায়ক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তারা ছিলেন অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি।
প্রতীকী প্রতিরোধ: ১৪ জুলাই রাতে রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীদের গেট ভেঙে বেরিয়ে আসার ঘটনাটি আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছিল।
বহুমাত্রিক অবদান: রাজপথের স্লোগানের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা, খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং তথ্য আদান-প্রদান—সব ফ্রন্টে নারীরা ছিলেন আপসহীন।
সামাজিক বৈধতা: মায়েরা যখন খাবার ও পানি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন, তখন এই আন্দোলন আর কেবল শিক্ষার্থীদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি রূপ নেয় এক সর্বগ্রাসী গণঅভ্যুত্থানে।
আড়ালে চলে যাওয়ার নেপথ্য চালচিত্র
বিজয় অর্জিত হওয়ার পর ক্ষমতার কাঠামোর মূল স্রোত থেকে নারীদের ছিটকে পড়ার পেছনে রয়েছে বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা।
পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো: রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ধারা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার কমিশনগুলোতে নারী প্রতিনিধিত্বের হার অত্যন্ত নগণ্য। নীতিনির্ধারণী টেবিলে নারীদের স্থান না দিয়ে তাদের কেবল প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
সাইবার বুলিং ও চরিত্রহনন: অনলাইন ট্রমা ও সাইবার বুলিং নারীদের জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। একটি গবেষণার তথ্য বলছে, আন্দোলনে আলোচিত নারীদের নিয়ে করা পোস্টগুলোর বড় একটি অংশে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা, বডি-শেমিং ও চরিত্রহননের মাধ্যমে তাদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
দলীয় উদাসীনতা ও কোটানির্ভরতা: রাজনৈতিক দলগুলো কাগজে-কলমে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললেও নির্বাচনে ন্যূনতম নারী প্রার্থী মনোনয়নের শর্ত মানতে নারাজ। যোগ্য নেতৃত্বকে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সুযোগ না দিয়ে সংরক্ষিত আসনে আটকে রাখার প্রবণতা তাদের রাজনৈতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা: দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও পারিবারিক ব্যাকআপের প্রয়োজন হয়, কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে তা অধিকাংশ নারীর পক্ষেই অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
এ প্রসঙ্গে নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভিন হক বলেছেন, ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় থেকেই নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। উপদেষ্টা পরিষদে নারী সদস্য ছিল খুবই কম এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মধ্যেও কোনো নারীকে রাখা হয়নি।
‘২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত প্রথম ছয়টি কমিশনে নারী সংস্কার কমিশন ছিল না। পরে ডিসেম্বরে এটিসহ আরও পাঁচটি কমিশন হয়। গঠনের পর আমরা অন্যান্য কমিশনগুলোর সঙ্গে বসতে চেয়েছি। সবাই ইতিবাচক থাকলেও সংবিধান সংস্কার কমিশন আমাদের সঙ্গে বসার জন্য সময় দেয়নি। তারা বলেছিল, তাদের কাজ শেষ পর্যায়ে হওয়ায় বসার প্রয়োজন নেই। এছাড়া পরবর্তীতে গঠিত ঐকমত্য কমিশনেও নারী কমিশনসহ দ্বিতীয় পর্যায়ে গঠিত পাঁচ কমিশনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।’
শিরীন পারভিন আরও বলেন, আমরা নারী সংস্কার কমিশন যেদিন প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলাম, প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদের অনেকেই অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত ছিলেন। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই একটি পক্ষ বিশাল জনসভা করে আমাদের প্রতিবেদনকে বাতিল ঘোষণা করল, আমাদের গালাগালি করল, অপমান করল। কিন্তু, গোটা উপদেষ্টা পরিষদ নীরব থাকল। সেই পরিস্থিতিতে কেবল একজন উপদেষ্টা আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন কিনা। আমি বলেছিলাম, আমার নিরাপত্তা নিয়ে না ভেবে কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে ভাবলে খুশি হবো।
উত্তরণের পথ: সংকট নাকি সুযোগ?
জুলাই অভ্যুত্থানের আসল শিক্ষা তখনই সার্থক হবে, যখন রাষ্ট্র এই অর্ধেক জনসংখ্যাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে। নারী নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখতে এবং নীতিনির্ধারণে তাদের জোরালো অবস্থান নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ।
আইনগত বাধ্যবাধকতা: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং তা না মানলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে হবে।
নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ: সাইবার অপরাধের কঠোর আইনি প্রতিকার এবং নারীবান্ধব রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মতবিরোধ ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্রহননে রূপ নেবে না।
সুপারিশমালার কার্যকর বাস্তবায়ন: নারী সংস্কার কমিশন কর্তৃক প্রস্তুতকৃত সুপারিশসমূহ রাজনৈতিক সদিচ্ছার সাথে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
সংকটকালে নারীরা ছিলেন এই জাতির ‘ঢাল’, কিন্তু সংকট কেটে যাওয়ার পর তাদের প্রতীকী উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ করে রাখা কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে না। জুলাইয়ের রক্তিম অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে যে, নারী নেতৃত্ব কোনো কৃপা বা দয়ার দান নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য অংশীদারিত্ব। একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে নীতিনির্ধারণের টেবিলে নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
দিক বার্তা / এমআরইউএস / ০৯ আগস্ট ২০২৬
