Dik Barta

ফ্রিল্যান্সিং থেকে গণমাধ্যম — ভিডিও এডিটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার পথ দেখাচ্ছেন রহিম সোহাগ

মোঃ রাকিব হোসেন
মোঃ রাকিব হোসেনপ্রতিবেদক
৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৩৪ পঠিত মিনিট পড়া
রহিম সোহাগ | ছবি: দিক বার্তা
রহিম সোহাগ | ছবি: দিক বার্তা

ডিজিটাল কনটেন্টের বিস্তারে বাড়ছে ভিডিও এডিটরের চাহিদা। সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন, ইউটিউব, বিজ্ঞাপন, করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্রিল্যান্সিং বিস্তৃত হচ্ছে কাজের ক্ষেত্র। নতুনদের কীভাবে শুরু করা উচিত, কোন দক্ষতাগুলো জরুরি এবং গণমাধ্যমে কাজের প্রস্তুতি নিয়ে জানিয়েছেন বাংলানিউজ২৪-এর ভিডিও এডিটর রহিম সোহাগ।

ডিজিটাল দুনিয়ায় কনটেন্টের ধরন বদলেছে, বদলেছে মানুষের তথ্য ও বিনোদন গ্রহণের অভ্যাসও। লিখিত প্রতিবেদনের পাশাপাশি ভিডিও এখন হয়ে উঠেছে যোগাযোগের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। সংবাদ থেকে বিজ্ঞাপন, ইউটিউব থেকে ফেসবুক, করপোরেট ব্র্যান্ড থেকে ব্যক্তিগত কনটেন্ট, প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভিডিওর উপস্থিতি দৃশ্যমান।

এর সঙ্গে তৈরি হয়েছে দক্ষ ভিডিও এডিটরের নতুন কর্মক্ষেত্র।

একটি কাঁচা ফুটেজকে দর্শকের উপযোগী করে তোলার কাজটি শুধু কাটিং বা ক্লিপ জোড়া দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দৃশ্য নির্বাচন, সঠিক জায়গায় কাট, বক্তব্যের বিন্যাস, শব্দের ব্যবহার, রঙের ভারসাম্য এবং উপস্থাপনার গতি সবকিছুর সমন্বয়ে তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও।

এই কারণেই ভিডিও এডিটিংকে এখন কেবল কারিগরি দক্ষতা নয়, বরং সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

কাট-ছাঁটের বাইরে ভিডিও এডিটিং

ভিডিও এডিটরের কাজ মূলত ধারণ করা ফুটেজের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান বেছে নিয়ে একটি অর্থবহ গল্প তৈরি করা। কোন দৃশ্য থাকবে, কোনটি বাদ যাবে কিংবা কোন বক্তব্যটি বেশি গুরুত্ব পাবে, এসব সিদ্ধান্ত ভিডিওর চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করে।

একজন দক্ষ এডিটর তাই শুধু সফটওয়্যারের বিভিন্ন টুল ব্যবহার করেন না; তিনি বুঝতে চেষ্টা করেন ভিডিওটির উদ্দেশ্য ও দর্শক কারা।

বাংলানিউজ২৪-এর ভিডিও এডিটর রহিম সোহাগের মতে, এডিটিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো গল্প বোঝার সক্ষমতা। সফটওয়্যার শেখার পাশাপাশি টাইমিং, ভিজ্যুয়াল সেন্স, অডিও এবং উপস্থাপনার ওপরও দখল তৈরি করতে হয়।

বাড়ছে কাজের পরিধি

ভিডিও এডিটিংয়ের সুযোগ এখন আর টেলিভিশন বা প্রোডাকশন হাউসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ডিজিটাল মিডিয়া, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স, সোশ্যাল মিডিয়া এজেন্সি ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কাছেও নিয়মিত ভিডিও কনটেন্টের প্রয়োজন হচ্ছে।

একইভাবে ইউটিউব ভিডিও, ফেসবুক রিলস, শর্টস, বিজ্ঞাপন, ডকুমেন্টারি, ওয়েডিং ভিডিও, শর্টফিল্ম ও ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের কনটেন্টেও এডিটরের ভূমিকা রয়েছে।

ফলে এই দক্ষতা দিয়ে একজন চাইলে প্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং বা ব্যক্তিগত ক্লায়েন্টের কাজও করতে পারেন। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রও প্রসারিত হওয়ার সুযোগ থাকে।

গণমাধ্যমে ভিডিও এডিটরের ভূমিকা

ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিস্তারের ফলে সংবাদমাধ্যমেও ভিডিওর গুরুত্ব বেড়েছে। একটি খবর এখন শুধু ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লিখিত প্রতিবেদন নয়; সেটিকে ভিডিও, শর্টস কিংবা রিলসের মাধ্যমে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে হয়।

এখানে একজন নিউজ ভিডিও এডিটরের কাজ কিছুটা আলাদা।

একটি রিপোর্ট থেকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য বের করা, প্রাসঙ্গিক ফুটেজ নির্বাচন, তথ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অল্প সময়ে মূল সংবাদটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাকে।

তাই গণমাধ্যমে কাজ করতে আগ্রহীদের জন্য ভিডিও এডিটিংয়ের পাশাপাশি নিউজ সেন্স তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

রহিম সোহাগের মতে, নিউজরুমে ভালো কাজ করতে হলে শুধু প্রিমিয়ার প্রো বা অন্য কোনো সফটওয়্যার জানা যথেষ্ট নয়। একটি সংবাদ কীভাবে তৈরি হয়, রিপোর্টের মূল বক্তব্য কোথায় এবং কোন ফুটেজটি সংবাদকে শক্তিশালী করে এসব বিষয়ও বুঝতে হবে।

ব্রেকিং নিউজে সময়ই বড় চ্যালেঞ্জ

সংবাদমাধ্যমে ভিডিও এডিটিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া। বিশেষ করে ব্রেকিং নিউজের ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে ভিডিও প্রস্তুত করে প্রকাশ করতে হয়।

তবে দ্রুততার সঙ্গে আপস করা যায় না তথ্যের নির্ভুলতায়।

ফুটেজ নির্বাচন থেকে বক্তব্যের ব্যবহার প্রতিটি ধাপেই সতর্ক থাকতে হয়। কারণ একটি ভুল ফুটেজ কিংবা বক্তব্যের ভুল উপস্থাপন পুরো সংবাদটির অর্থ বদলে দিতে পারে।

তাই নিউজ ভিডিও এডিটরের জন্য গতি, নির্ভুলতা ও দায়িত্ববোধ—তিনটির সমন্বয় জরুরি।

নতুনদের শুরুটা যেভাবে

ভিডিও এডিটিং শেখার ক্ষেত্রে নতুনদের একসঙ্গে অনেক সফটওয়্যার শেখার প্রয়োজন নেই। একটি সফটওয়্যার দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে দক্ষতা বাড়ানোই কার্যকর পথ।

শুরুতে কাটিং, ট্রিমিং, টাইমলাইন ব্যবস্থাপনা, অডিও এডিটিং, টাইটেল ও গ্রাফিক্সের মতো মৌলিক বিষয় আয়ত্ত করা যেতে পারে। এরপর কালার কারেকশন, কালার গ্রেডিং, মোশন গ্রাফিক্স ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের মতো তুলনামূলক উন্নত বিষয় শেখা যেতে পারে।

তবে শেখার প্রতিটি ধাপের সঙ্গে বাস্তব অনুশীলন যুক্ত করা জরুরি।

টিউটোরিয়াল নয়, দক্ষতা তৈরি হয় কাজে

অনলাইনে ভিডিও এডিটিং শেখার অসংখ্য সুযোগ থাকলেও শুধু টিউটোরিয়াল দেখলে দক্ষতা তৈরি হয় না।

একটি টুল কীভাবে কাজ করে তা শেখা যায় ভিডিও দেখে; কিন্তু সেটি কখন এবং কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেই বিচারবোধ তৈরি হয় বাস্তব কাজের মাধ্যমে।

তাই শেখার পাশাপাশি নিজের হাতে নিয়মিত ভিডিও তৈরি করা, ভুল খুঁজে বের করা এবং কাজের মান ধীরে ধীরে উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

রহিম সোহাগের পরামর্শ, নতুনদের যত বেশি কাজ করার অভ্যাস হবে, তত দ্রুত নিজেদের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পারবেন। সেই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার ধারাবাহিকতাই দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করবে।

পোর্টফোলিওই হতে পারে প্রথম পরিচয়

ভিডিও এডিটিং শেখার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো পোর্টফোলিও তৈরি করা।

চাকরি কিংবা ফ্রিল্যান্সিং দুই ক্ষেত্রেই নিজের দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে কাজ দেখানোর প্রয়োজন হয়। তাই শেখার সময় থেকেই ছোট ছোট প্রজেক্ট তৈরি করে সেগুলোর মধ্য থেকে সেরা কাজগুলো সংরক্ষণ করা উচিত।

শুরুতে বড় ক্লায়েন্টের অপেক্ষায় না থেকে নিজের উদ্যোগে নিউজ ভিডিও, শর্টফর্ম কনটেন্ট, বিজ্ঞাপন বা অন্য ধরনের ভিডিও তৈরি করা যেতে পারে। এতে একদিকে অভিজ্ঞতা বাড়বে, অন্যদিকে কাজ দেখানোর মতো উপাদানও তৈরি হবে।

নতুনদের যে ভুলটি এড়ানো দরকার

ভিডিও এডিটিং শেখার শুরুতেই দ্রুত আয় করার চিন্তা অনেকের মধ্যে থাকে। কিন্তু দক্ষতা তৈরির আগেই আয়ের পেছনে ছুটলে শেখার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শুরুর দিকে তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পোর্টফোলিও

অন্যের ভালো কাজ দেখা এবং সেটি বিশ্লেষণ করার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় কেন কাট দেওয়া হয়েছে, একটি শট কতক্ষণ রাখা হয়েছে কিংবা কোন সাউন্ড কেন ব্যবহার করা হয়েছে, এসব খেয়াল করলে ধীরে ধীরে সম্পাদনার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।

সফটওয়্যারের পাশাপাশি তৈরি করতে হবে ‘এডিটিং আই’

একজন দক্ষ এডিটরকে শুধু জানতে হয় না কোন বাটনে ক্লিক করতে হবে; তাকে বুঝতে হয় কোন জায়গায় কী করা উচিত

এই বিচারবোধ তৈরির জন্য বিভিন্ন ধরনের ভালো কনটেন্ট দেখা প্রয়োজন। সিনেমা, ডকুমেন্টারি, বিজ্ঞাপন, সংবাদ ভিডিও কিংবা ইউটিউব কনটেন্ট প্রতিটি মাধ্যম থেকেই শেখার সুযোগ রয়েছে।

নিয়মিত এসব কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ করলে শট নির্বাচন, কাটের গতি, সাউন্ড, রঙ ও গল্প বলার ধরন সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে এই অভিজ্ঞতাই একজন এডিটরের নিজস্ব স্টাইল গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

ক্যারিয়ারের পথ কোন দিকে?

একজন নতুন এডিটরের ক্যারিয়ার শুরু হতে পারে খুব ছোট পরিসর থেকেই। প্রথমে শেখা, এরপর নিয়মিত অনুশীলন, ছোট প্রজেক্ট তৈরি, পোর্টফোলিও গড়া এবং বাস্তব কাজে যুক্ত হওয়া এই ধারাবাহিকতায় এগোলে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে নিজের দক্ষতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষায়িত হওয়া যেতে পারে। কেউ নিউজ ভিডিওতে, কেউ শর্টফর্ম কনটেন্টে, কেউ বিজ্ঞাপন বা করপোরেট ভিডিওতে আবার কেউ ফ্রিল্যান্সিংয়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেন।

অর্থাৎ, ভিডিও এডিটিং শেখার পর ক্যারিয়ারের পথ একটি নয়; বরং একাধিক।

সামনে সম্ভাবনার জায়গা আরও বড়

ডিজিটাল কনটেন্টের বিস্তার যত বাড়ছে, ভিডিও সম্পাদনার প্রয়োজনও তত বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক কনটেন্টের দ্রুত প্রসারে এডিটরদের কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুনদের শুধু সফটওয়্যারনির্ভর দক্ষতা নয়, গল্প বলার ক্ষমতা, ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন, কনটেন্ট বোঝার সক্ষমতা এবং পেশাদার কর্মদক্ষতা গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন রহিম সোহাগ।

তার মতে, প্রতিদিনের শেখা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়েই একজন নতুন এডিটর ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন।

ভিডিও এডিটিং এখন এমন একটি দক্ষতা, যার ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে গণমাধ্যম থেকে বিনোদন, বিজ্ঞাপন থেকে করপোরেট যোগাযোগ এবং চাকরি থেকে ফ্রিল্যান্সিং পর্যন্ত।

এই পেশায় প্রবেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো শেখার ধারাবাহিকতা। একটি সফটওয়্যার ভালোভাবে আয়ত্ত করা, নিয়মিত বাস্তব প্রজেক্টে কাজ করা, নিজের পোর্টফোলিও তৈরি করা এবং ভালো কাজ বিশ্লেষণের অভ্যাস গড়ে তোলা, এই কয়েকটি ধাপ একজন নতুনকে পেশাদার পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

শুরুটা ছোট হলেও সমস্যা নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিটি কাজ থেকে কিছু শেখা এবং পরের কাজটিকে আগেরটির চেয়ে ভালো করার চেষ্টা করা।

ভিডিও এডিটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার পথ তাই কোনো রাতারাতি সাফল্যের গল্প নয়; বরং দক্ষতা, অনুশীলন ও ধৈর্যের দীর্ঘ যাত্রা।

দিক বার্তা

সংবাদটি শেয়ার করুন: