বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে দেশিগ্রাম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানেই এখন Facebook, TikTok কিংবা Instagram। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে আছে এসব প্ল্যাটফর্ম। সেই বৈশ্বিক ভিড়েই এবার নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সামনে এসেছে বাংলাদেশের তৈরি সামাজিক যোগাযোগ ও কমিউনিকেশন প্ল্যাটফর্ম DeshiGram।
শুধু ‘আরেকটি সোশ্যাল মিডিয়া’ হওয়ার লক্ষ্য নয়—Blockchain ও Artificial Intelligence (AI)-এর সমন্বয়ে ভিন্নধর্মী একটি প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে প্ল্যাটফর্মটি।
আর শুরুতেই মিলেছে বেশ ভালো সাড়া। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান DeshiChain Ecosystem-এর দাবি, DeshiGram-এর Public Beta চালুর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ২০ হাজার ব্যবহারকারী প্ল্যাটফর্মটিতে যুক্ত হয়েছেন।
➤ বাংলাদেশ থেকে শুরু, চোখ বিশ্বজুড়ে
DeshiGram-এর পেছনে থাকা প্রতিষ্ঠান DeshiChain Ecosystem-এর ফাউন্ডার ও সিইও রাহাত জিদনি ওসামা বলছেন, বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতেই এই উদ্যোগ।
তবে সেই দরজার গন্তব্য শুধু বাংলাদেশ নয়। শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে প্ল্যাটফর্মটির প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবহারকারীরা DeshiGram-এ যুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের মাটিতে তৈরি একটি প্ল্যাটফর্মের প্রথম দিকের যাত্রাতেই মিলছে আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ইঙ্গিত।
➤ পোস্ট থেকে রিলস, সোশ্যাল মিডিয়ার চেনা অভিজ্ঞতা এক জায়গায়
নতুন প্ল্যাটফর্ম হলেও ব্যবহারকারীদের জন্য একেবারে অপরিচিত কোনো জগৎ তৈরি করেনি DeshiGram।
এখানে রয়েছে Post, Story, Reels, Comment, Reaction, Follow এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মতো পরিচিত সামাজিক যোগাযোগের ফিচার।
ফলে যারা Facebook বা Instagram-এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে অভ্যস্ত, তাদের জন্য DeshiGram-এর ব্যবহারও অনেকটা পরিচিত অভিজ্ঞতার মতো হতে পারে।
তবে প্ল্যাটফর্মটির আসল পার্থক্য তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে এর প্রযুক্তিগত ভিত্তিতে।
➤ শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নয়, পেছনে AI ও Blockchain
DeshiGram-এর অন্যতম আলোচিত দিক হলো এর AI ও Blockchain-নির্ভর প্রযুক্তিগত কাঠামো।
প্রচলিত সোশ্যাল মিডিয়ার মতো শুধু ব্যবহারকারীদের সংযুক্ত করার ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব প্রযুক্তিগত অবকাঠামোকে গুরুত্ব দিচ্ছে প্ল্যাটফর্মটি।
ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টিও রাখা হয়েছে গুরুত্বের তালিকায়। এ জন্য উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, AI Moderation এবং বিভিন্ন Privacy-Centric Technology যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।
Public Beta পর্যায়ে থাকার কারণে সামনে আরও পরিবর্তন ও নতুন ফিচার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
➤ আজ পোস্ট-রিলস, আগামীতে AI-পেমেন্ট-ব্লকচেইন
DeshiGram-এর পরিকল্পনা শুধু ছবি পোস্ট করা কিংবা রিলস দেখার মধ্যে আটকে নেই।
ভবিষ্যতের রূপরেখায় রয়েছে নিজস্ব Large Language Model (LLM), উন্নত AI Services, Creator Monetization System এবং Digital Payments Integration।
এর পাশাপাশি DeshiGram-কে DeshiChain Blockchain-এর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থাৎ, ব্যবহারকারী যেখানে এখন সামাজিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন, ভবিষ্যতে সেই একই ইকোসিস্টেমে AI, ডিজিটাল পেমেন্ট ও Blockchain-ভিত্তিক বিভিন্ন সেবাও যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
➤ রাহাত জিদনির স্বপ্ন, বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না
DeshiGram-এর ফাউন্ডার ও সিইও রাহাত জিদনি ওসামার ভাষায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু অন্যের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশ শুধু বিশ্বের প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না, বরং এমন প্রযুক্তি তৈরি করবে যা একদিন বিশ্ব ব্যবহার করবে। DeshiGram সেই দীর্ঘমেয়াদি ভিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।”
এই বক্তব্যের মধ্যেই পরিষ্কার হয়, উদ্যোগটির লক্ষ্য কেবল একটি অ্যাপের ব্যবহারকারী বাড়ানো নয়; বরং বাংলাদেশ থেকে একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করানোর চেষ্টা।
➤ ৮–১০ বছরের পরিকল্পনা, লক্ষ্য আরও বড়
DeshiGram-এর সবচেয়ে বড় চমক সম্ভবত এর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, আগামী ৮ থেকে ১০ বছরে ধাপে ধাপে একটি বৃহৎ প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা—যেখানে Social Networking-এর পাশাপাশি AI, Blockchain Infrastructure, Digital Payments এবং অন্যান্য ডিজিটাল সেবাও একই ছাতার নিচে থাকবে।
আরও বড় পরিসরে DeshiGram-কে ভবিষ্যতের Decentralized Civilization এবং Blockchain Industry-এর জন্য একটি Trusted Digital Platform হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
➤ সামনে বড় পরীক্ষা
তবে ১২০ দেশে ২০ হাজার ব্যবহারকারীর প্রাথমিক সাড়া নিঃসন্দেহে আলোচনার মতো হলেও, একটি নতুন প্ল্যাটফর্মের জন্য আসল পরীক্ষা শুরু হয় এর পরেই।
ব্যবহারকারীদের ধরে রাখা, নিয়মিত নতুন ফিচার আনা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আকৃষ্ট করা এবং বড় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সবই হবে DeshiGram-এর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় শুধু নতুন হওয়া যথেষ্ট নয়; ব্যবহারকারীর সময়, আস্থা ও অভ্যাস এই তিনটি জয় করাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
DeshiGram সেই কঠিন পথেই যাত্রা শুরু করেছে।
বাংলাদেশে তৈরি এই প্ল্যাটফর্ম আগামী কয়েক মাসে কতটা এগোয়, আর আগামী ৮–১০ বছরের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবে রূপ নেয় সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট বাংলাদেশের তৈরি প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বমঞ্চে বড় স্বপ্ন দেখার গল্পটি শুরু হয়ে গেছে। আর সেই গল্পের নতুন নাম ‘DeshiGram’।
দিক বার্তা / এমআরইউএস / ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
