নতুন উত্তরাধিকার আইনে মা-বাবার সুরক্ষা নাকি ঝুঁকি?

নতুন আইন নিয়ে সবচেয়ে বড় আলোচনা তৈরি হয়েছে হেবা ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে ঘিরে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে হেবা সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি প্রচলিত পদ্ধতি। বিরোধীদের আশঙ্কা, নতুন বিধানের কারণে হেবা ও মুসলিম উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
সম্পত্তি সন্তানের নামে লিখে দেওয়ার পরও বাবা-মা সেই সম্পত্তিতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকার ও ভোগের অধিকার রাখতে পারবেন—সম্প্রতি পাস হওয়া নতুন আইনে এমন ব্যবস্থাই করা হয়েছে। অর্থাৎ বাবা-মা সম্পত্তির মালিকানা সন্তানের কাছে হস্তান্তর করলেও নিজেদের জীবনকালীন ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। সন্তানের নামে দলিল হয়ে গেলেও তিনি চাইলে বাবা-মাকে ওই বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারবেন না।
১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সংশোধন এনে এই নতুন ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন বিধানে নির্দিষ্ট আত্মীয়ের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও দাতার জীবনকালীন ব্যবহার ও ভোগের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনটির মূল উদ্দেশ্য উত্তরাধিকার ভাগ পরিবর্তন করা নয়; বরং সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর বৃদ্ধ বাবা-মা যাতে নিজেদের বসতভিটা বা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের ব্যাখ্যাতেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মালিকানা ও ভোগের অধিকারকে আলাদা করে দেখা। কোনো বাবা তাঁর বাড়ি বা জমি সন্তানের নামে দান করলে এবং সেই দান আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হলে মালিকানা সন্তানের কাছে চলে যাবে। কিন্তু বাবা যদি জীবনকালীন ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করেন, তাহলে জীবিত থাকা পর্যন্ত তিনি ওই সম্পত্তিতে বসবাস ও ব্যবহার করতে পারবেন। তাঁর এই অধিকার বিক্রি, বন্ধক বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তরের অধিকার নয়; মূলত নিজের জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগের অধিকার।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে বাস্তব সামাজিক সমস্যা। অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর শেষ বয়সে সেই সম্পত্তিতেই অনিরাপদ হয়ে পড়েন। সন্তান কখনো তাঁদের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করে, কখনো ভরণপোষণ বন্ধ করে দেয়। বিদ্যমান আইনে বাবা-মায়ের ভরণপোষণের ব্যবস্থা থাকলেও অধিকার আদায়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। কিন্তু বয়স ও পারিবারিক সম্পর্কের কারণে অনেক বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। নতুন আইনের লক্ষ্য হলো, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই সম্পত্তির দলিলে দাতার জীবনকালীন ভোগের অধিকারকে সুরক্ষিত করা।
তবে নতুন আইন নিয়ে সবচেয়ে বড় আলোচনা তৈরি হয়েছে হেবা ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে ঘিরে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে হেবা সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি প্রচলিত পদ্ধতি। বিরোধীদের আশঙ্কা, নতুন বিধানের কারণে হেবা ও মুসলিম উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাঁর মতে, নতুন বিধান হেবা, সাধারণ দান কিংবা অন্য ধর্মের ব্যক্তিগত আইনে স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরকে বাতিল করছে না; বরং এটি একটি অতিরিক্ত আইনি সুযোগ তৈরি করছে।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বৈধভাবে দান করা এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পত্তি পাওয়া একই বিষয় নয়। উত্তরাধিকার কার্যকর হয় মৃত্যুর পর, আর জীবিত অবস্থায় সম্পত্তির মালিক আইনসম্মতভাবে নিজের সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। ফলে নতুন আইনকে উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তনের আইন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নতুন আইনের কারণে পরিবারে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ কমবেই। একজন বাবা জীবিত অবস্থায় তাঁর অধিকাংশ বা পুরো সম্পত্তি একজন সন্তানকে দিয়ে দিতে পারেন। এতে অন্য সন্তানরা ভবিষ্যতে উত্তরাধিকার হিসেবে যে সম্পত্তি পেতেন, তার পরিমাণ কমে যেতে পারে। নতুন আইন এমন দানকে উত্তরাধিকার আইনের নিয়মে ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে না। অর্থাৎ বাবা-মায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পরিবারের সব উত্তরাধিকারীর মধ্যে সম্পত্তির ন্যায্য বণ্টন—দুটি আলাদা বিষয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দাতার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভোগের অধিকার। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রহীতা দাতার আগে মারা গেলেও দাতার সংরক্ষিত জীবনকালীন ভোগের অধিকার বহাল থাকবে। পরে গ্রহীতার বৈধ উত্তরাধিকারীদের কাছে সম্পত্তির মালিকানা যাওয়ার প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। ফলে নতুন আইনে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে, যেখানে একজন ব্যক্তি সম্পত্তির মালিক নন, কিন্তু আইন অনুযায়ী সেই সম্পত্তি ভোগ করছেন।
দাতার ভোগের অধিকার কেউ লঙ্ঘন করলে আদালতে যাওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দাতা জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন। ফলে আইনটি মামলা পুরোপুরি বন্ধ করবে এমন নয়; বরং সম্পত্তি দানের পর দাতার নির্দিষ্ট অধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রতিকার পাওয়ার পথ তৈরি করবে। বাস্তবে এই ব্যবস্থা কতটা দ্রুত ও কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আদালতে এর প্রয়োগের ওপর।
ধর্মীয় আইনের ক্ষেত্রেও সরকার বলছে, নতুন বিধান সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য হলেও কোনো ধর্মের ব্যক্তিগত আইনকে বাধাগ্রস্ত করবে না। সংসদীয় আলোচনায় নতুন ১২২A ও ১২২B ধারার মাধ্যমে জীবনকালীন ভোগাধিকার-সংরক্ষিত হস্তান্তরের আলাদা কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। তবে এই বিধান হেবা ও উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে, তার অনেকটাই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে আদালতের ব্যাখ্যার ওপর।
সব মিলিয়ে নতুন আইনের মূল পরিবর্তন এক জায়গাতেই—সম্পত্তি দান করলে মালিকানা সন্তানের কাছে যেতে পারে, কিন্তু দাতা তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগের অধিকার ধরে রাখতে পারবেন। এটি উত্তরাধিকার আইন বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নয়; বরং সম্পত্তি দানের পর বাবা-মায়ের জীবনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি নতুন আইনি পথ। তবে একই সঙ্গে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর, হেবা, উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক বিরোধ—এই চারটি বিষয় ভবিষ্যতে আদালতের সামনে নতুন ধরনের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
দিক বার্তা / এমআরইউএস / ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
