অনলাইন নারীদের হয়রানি: পরিচিত মুখও অভিযুক্ত, প্রতিকারের পথে বড় ফাঁক

ধর্ষণের পর হত্যার শিকার এক কিশোরীও রেহায় পাচ্ছে না অনলাইন হয়রানি থেকে। কোথায় গিয়েছিল, কেন একা গেল, কেন রাতের বেলা বাড়ির বাইরে থাকল-এরকম নানা রকম প্রশ্নসহ অশ্লীল ও নোংরা মন্তব্যও বাদ যাচ্ছে না। কুমিল্লার লালমাইয়ে হত্যার শিকার তাজমিনকে নিয়ে ফেসবুকে অশালীন মন্তব্য থামেনি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা নারীও হয়ে উঠছেন ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্য। এসব মন্তব্যকারীর মধ্যে শুধু অজ্ঞাতনামা অ্যাকাউন্ট নয়, চিকিৎসক, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের পরিচয়ও সামনে আসছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত পরিচয় কতটা নির্ভুল এবং হয়রানির শিকার নারীরা কতটা প্রতিকার পাচ্ছেন—দুটি প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্ষণের পর হত্যার শিকার এক কিশোরীও রেহায় পাচ্ছে না অনলাইন হয়রানি থেকে। কোথায় গিয়েছিল, কেন একা গেল, কেন রাতের বেলা বাড়ির বাইরে থাকল-এরকম নানা রকম প্রশ্নসহ অশ্লীল ও নোংরা মন্তব্যও বাদ যাচ্ছে না। কুমিল্লার লালমাইয়ে হত্যার শিকার তাজমিনকে নিয়ে ফেসবুকে অশালীন মন্তব্য থামেনি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা নারীও হয়ে উঠছেন ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্য। এসব মন্তব্যকারীর মধ্যে শুধু অজ্ঞাতনামা অ্যাকাউন্ট নয়, চিকিৎসক, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের পরিচয়ও সামনে আসছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত পরিচয় কতটা নির্ভুল এবং হয়রানির শিকার নারীরা কতটা প্রতিকার পাচ্ছেন—দুটি প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামে একটি গ্রুপের উদ্যোগ। ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর চালু হওয়া ফেসবুক গ্রুপটি নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকারীদের ছবি, পরিচয় ও প্রোফাইলের লিংক প্রকাশ করছে। তাদের দাবি, শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সতর্কও করেছে। উদ্যোগটি সামাজিক জবাবদিহির দাবি সামনে আনলেও এটি অপরাধ প্রমাণের বিচারিক প্রক্রিয়া নয়।
নারীর অনলাইন হয়রানির বিস্তার বোঝায় অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ২০২২ সালের জরিপ। সম্পূর্ণ উত্তর দেওয়া ৩৫৯ জন নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে ২২৮ জন, অর্থাৎ ৬৩.৫১ শতাংশ, অনলাইন সহিংসতার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। ২০২১ সালের জরিপে হার ছিল ৫০.১৯ শতাংশ। তবে ছোট অনলাইন নমুনার এই ফলকে দেশের সব নারী কিংবা ২০২৬ সালের পরিস্থিতির হার হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
বৃহত্তর চিত্র পাওয়া যায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’-এ। ইউএনএফপিএর সহায়তায় পরিচালিত জরিপে ১৫ বছর বা বেশি বয়সী ২৭ হাজার ৪৭৬ নারী অংশ নেন। জীবনে কোনো সময়ে নির্দিষ্ট ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন ৮.৩ শতাংশ; আগের ১২ মাসে ৫.২ শতাংশ। এতে সীমিত কয়েকটি আচরণ মাপা হয়েছে, হয়রানির সব ধরন নয়। ফলে অ্যাকশনএইডের ফলের সঙ্গে সরাসরি তুলনা চলে না। বয়সভিত্তিক হিসাবে ২০ থেকে ২৪ বছরের নারীদের মধ্যে এই সহিংসতার হার ১৬ শতাংশ। ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহারকারী নারীদের ক্ষেত্রে হার ১০.৩ শতাংশ। বয়স ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বিবেচনায় ঝুঁকির চিত্র তাই বদলে যায়।
অ্যাকশনএইডের জরিপে হয়রানির ধরনগুলোর মধ্যে অশ্লীল, যৌন বা বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের হার ৮০.৪ শতাংশ; যৌন ছবি পাঠানো বা যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব ৫৩.৩ শতাংশ। ভুক্তভোগীর নামে ভুয়া আইডি তৈরির অভিজ্ঞতা ১৭.৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি হয়রানির মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার। অর্থাৎ মন্তব্যের ঘর থেকে ব্যক্তিগত ইনবক্স—উভয় জায়গাতেই ঝুঁকি রয়েছে।
হয়রানি করছেন কারা? বিবিএসের প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি বা ব্ল্যাকমেলের ভুক্তভোগীদের ৪৮.৫ শতাংশ সম্পূর্ণ অপরিচিত পুরুষকে দায়ী করেছেন। নতুন পরিচিত পুরুষের ক্ষেত্রে হার ১৬.৫ শতাংশ, পুরুষ বন্ধুর ক্ষেত্রে ১০.৭ শতাংশ। স্বামী, সাবেক স্বামী, সহপাঠী ও আত্মীয়ের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে।
আবার প্রোফাইলে দেওয়া পরিচয়ই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। কারণ এরকম ঘটনাও ঘটেছে, নোংরা মন্তব্যকারী নিজেকে একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিলেও প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ওই নামে তাদের কর্মী নেই। ব্লাস্টের সাইবার সহায়তা উদ্যোগের ফোকাল পারসন মনীষা বিশ্বাসও পরিচয় প্রকাশের আগে যাচাইয়ের প্রয়োজন জানিয়েছেন। কার ছবি ব্যবহৃত হয়েছে আর কে অ্যাকাউন্ট চালাচ্ছেন—এক প্রশ্ন নয়; ভুল শনাক্তকরণে নির্দোষ ব্যক্তিও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকিও থাকছে।
প্রতিকার চাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ফাঁক রয়েছে। অ্যাকশনএইডের হিসাবে প্রায় ১৫ শতাংশ নারী আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগকারীদের ৪৪.১২ শতাংশ ফেসবুকের রিপোর্টিং ব্যবস্থা ব্যবহার করেছেন। অভিযোগ করা নারীদের ৬৪.৭১ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের অভিযোগে প্রতিকার বা ব্যবস্থা মেলেনি।
পুলিশের কাছে যাওয়ার একটি পৃথক চিত্র দিয়েছে বাইটস ফর অল বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের ২০২২ সালের গবেষণা। শতাধিক নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ছোট জরিপে হয়রানির পর পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর হার ছিল ১২ শতাংশ। প্রশ্নে নিজের পাশাপাশি পরিচিতজনের অভিজ্ঞতাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই গবেষণায় ১৫.৭ শতাংশ অনলাইন কার্যক্রম সীমিত করা এবং ১২.৯ শতাংশ প্রোফাইল বন্ধ করার কথা জানান।
গত ২ মার্চ ঢাকায় প্রথম আলো ও সিএসডব্লিউসি আয়োজিত গোলটেবিলে পাঁচ বছরে ৮৭ হাজার ৭২৭টি অভিযোগ, ৫২ হাজার ৭০২টিতে ব্যবস্থা এবং ১৮০ মামলার তথ্য দেন ডিআইজি তাপতুন নাসরীন। উদ্ধৃত সংখ্যায় মামলা ও অভিযোগের অনুপাত প্রায় ০.২১ শতাংশ। এটি দেশের সব ভুক্তভোগীর মামলা করার হার নয়।
গোলটেবিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক ডিজিটাল সাক্ষ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে দুর্বলতার কথা বলেন। আইনজীবী সারা হোসেনের মতে, অপরাধের নতুন ধরনের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার সামঞ্জস্য প্রয়োজন। নারীবিদ্বেষ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয়ও তিনি সামনে আনেন। প্রযুক্তি দিয়ে ছবি বিকৃত করা, ব্যক্তিগত তথ্য ছড়ানো এবং ব্ল্যাকমেল মোকাবিলায় তাই শুধু কনটেন্ট সরিয়ে দেওয়াকে সম্পূর্ণ প্রতিকার ধরা যাচ্ছে না।
গোলটেবিলের সুপারিশে এসেছে গোপনীয়তা রক্ষা, প্রশিক্ষিত সাইবার সেল, সাক্ষ্য সংরক্ষণ, মামলার তদারকি ও বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা। ভুক্তভোগীকে নীরব রাখার বদলে নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং অভিযুক্তের যাচাইকৃত পরিচয়ে জবাবদিহিই এসব প্রস্তাবের লক্ষ্য।
