ফ্যামিলি কার্ড: ভঙ্গুর অর্থনীতির আড়ালে প্রণোদনার বিজ্ঞাপন!

আগামী ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জের লতিফাবাদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে সরকারের 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচি বিতরণ। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সচিবালয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।
পরীক্ষামূলক বিতরণের সাফল্যের পর আগামী ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জের লতিফাবাদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে সরকারের 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচি। বৃহস্পতিবার (০৬ আগস্ট) সচিবালয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন, আগামী ৪ বছরে দেশের ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, ভোগ্য পণ্য, ওষুধসহ অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের দুর্মূল্যের বাজারে ফ্যামিলি কার্ড কতটা যৌক্তিক- তা নিয়ে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে পরিবার কার্ড কি আদৌ কোনো কাজে আসছে? যেসব পরিবার কার্ড পাচ্ছে না, তারা কী করবে। বাজারের আসেপাশে গেলেই দেখা যাচ্ছে জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
বনশ্রীর বাসিন্দা জয়ন্তি সরকার গলা চড়িয়ে বকাবকি করতে করতে বাজারের ব্যাগ হাতে ফিরছিলেন। জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, কাঁচাবাজার করতে এসেছিলেন। দাম নিয়ে দোকানদারদের সাথে বচসা হওয়ায় মেজাজ হারিয়ে ফেলেছেন।
জয়ন্তি বলেন, সব শাক-সবজির দাম বাড়তি। ২২০ টাকা কেজি চায় ঝিঙা, কাঁচা মরিচ তো হাত দিয়ে ছোঁয়ার উপায় নাই। একটি চাল-কুমড়া ৮০ টাকা চায়। দোকানদাররা বলছে, বর্ষাকাল দাম এরকম হবেই।
সরকার থেকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হচ্ছে, তিনি তা নিতে আগ্রহী কিনা প্রশ্ন করলে জয়ন্তি সরকার বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড কারা পাবেন, কারা পাবেন না, তা নির্ধারণ করে রাজনৈতিক লোকজন। আর ফ্যামিলি কার্ডের গ্রাহকরা যে দামে পণ্য কিনতে পাবেন, সেই একই দামে পাওয়ার অধিকার আমিও রাখি। কেন আমাকে ৪০০ টাকা কেজি কাঁচা মরিচ কিনতে হবে? আর ফ্যামিলি কার্ডে তো ধরাবাঁধা কয়েকটি পণ্য দেয়।
তিনি আরও বলেন, সব পণ্য ন্যায্য দামে পাওয়ার অধিকার আমারও আছে। ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে কিছু লোকের বাহবা পেতে পারে সরকার, কিন্তু অধিকাংশ লোকের দিকে সরকার তাকাচ্ছে না। এর আগেও পরিস্থিতি যেমন ছিল, এখনও তেমনই আছে কোনো পরিবর্তন হয়নি নতুন সরকার এসে।’
বেসরকারি চাকরিজীবী ফারজানা ইয়াছমিন বলেন, ‘কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নাগালের মধ্যে আনতে হবে। এসব ফ্যামিলি কার্ড এক ধরনের স্টান্টবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে, এসব কার্ড কারোরই লাগবে না।’
শুধু জয়ন্তি সরকার কিংবা ফারজানা-ই নয়, এমন অবস্থা অধিকাংশ মানুষের-ই। বাজারে গেলে নাভিশ্বাস উঠছে ক্রেতাদের। সেই সাথে দোকানিদের সাথে ঝগড়া বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এরকম অবস্থায় ফ্যামিলি কার্ড কতটা কাজে আসবে-সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে গতিশীল সামাজিক নিবন্ধন, তিন স্তরের তদারকি আর নারীর ক্ষমতায়নের গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এটিকে একটি যুগান্তকারী মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার বৃহত্তর ক্যানভাসে তাকালে বোঝা যায় বিষয়টি পুরো স্রোতে বইছে।
এত বিপুলসংখ্যক পরিবারকে যখন বেঁচে থাকার জন্য টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে হয়, তখন তাকে কি 'উন্নয়ন' বলা চলে? নাকি এটি লাগামহীন দ্রব্যমূল্য এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের কাঠামোগত ব্যর্থতার এক করুণ স্বীকারোক্তি?
দেশের অর্ধেক মানুষ ফ্যামিলি কার্ডের লাইনে!
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবার মানে দেশের প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি মানুষ (গড়ে ৪ সদস্য ধরলেও) এই কার্ডের ওপর নির্ভরশীল হবে।
একটি দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে যখন ভর্তুকির কার্ড হাতে ধরিয়ে দিতে হয়, তখন বুঝতে হবে সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে পারছে না। ফ্যামিলি কার্ড আসলে কোনো টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি নয়; এটি দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে পিষ্ট জনগণকে সাময়িক শান্ত রাখার একটি রাজনৈতিক 'পেইন কিলার' মাত্র।
বাজার সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ ও কর্মসংস্থানহীনতা
ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে মূলত বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙার বদলে তাদের কাছে একপ্রকার আত্মসমর্পণই করেছে সরকার। সাধারণ মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন অনুদান বা কার্ড নয়; তাদের প্রয়োজন টেকসই কর্মসংস্থান এবং একটি সহনীয় বাজারব্যবস্থা।
বাজারে নিত্যপণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পুরোপুরি বাইরে। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক কোটি মানুষকে কার্ড ধরিয়ে দিলে বাকিদের কী হবে? যে কোটি কোটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবার এই কার্ডের যোগ্যতা অর্জন করবে না, তারা কীভাবে এই আকাশছোঁয়া বাজারে টিকে থাকবে—তার কোনো সুস্পষ্ট উত্তর সরকারের এই ‘ডাইনামিক’ মডেলে নেই।
তদারকির নামে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
সরকার দাবি করছে, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তিন স্তরের মনিটরিং এবং অনলাইনে তথ্য হালনাগাদের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী ৫৬টি এলাকার পাইলট প্রকল্পে মাত্র ৩ শতাংশ ত্রুটির কথা বলে আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের সুবিধার তালিকা প্রণয়নে সবসময়ই রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটে। দেশজুড়ে এই কর্মসূচি যখন পূর্ণাঙ্গ রূপ নেবে, তখন প্রকৃত দরিদ্ররা কতটা সুবিধা পাবেন আর কতজন মধ্যস্বত্বভোগী এর ফায়দা লুটবে, তা সময়ই বলে দেবে।
পরিবারের নারীদের হাতে সহায়তার অর্থ পৌঁছালে তা পুষ্টি ও শিক্ষায় কাজে লাগবে—তত্ত্ব হিসেবে এটি চমৎকার। কিন্তু যে দেশে কর্মসংস্থান স্থবির, আর বাজারের আগুনে পুড়ছে সাধারণ মানুষ, সেখানে এই সামান্য সহায়তা শুধু তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে কিছুটা দীর্ঘায়িত করবে মাত্র।
সরকারের উচিত ফ্যামিলি কার্ডের মতো নির্ভরশীলতার মেগা প্রকল্প তৈরি না করে, বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দ্রব্যমূল্য মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে আনা এবং কাজের সুযোগ তৈরি করা।
যদি তা না হয়, তবে চার বছরে যে ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবার কার্ড হয়ত পাবে। কিন্তু আগামী কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতির রুগ্ন দশায় এই লাইন আরও দীর্ঘতর হওয়া ছাড়া কমার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
দিক বার্তা / এমআরইউএস / ০৭ আগস্ট ২০২৬
