ডেটিং অ্যাপ কি 'নৈতিক আতঙ্কে'র প্রশ্ন?

বাজার-গবেষণা সংস্থা স্ট্যাটিস্টার হিসাবে বাংলাদেশে অনলাইন ডেটিং সেবার ব্যবহারকারীর সংখ্যা টানা এগারো বছর ধরে বাড়ছে তাদের পূর্বাভাস, এই দশকের শেষে সংখ্যাটা এক কোটি আটত্রিশ লাখে পৌঁছাবে।
আমাদের সমাজে প্রেম নিয়ে যত উচ্চকিত তর্ক হয়, প্রেমের বন্দোবস্ত নিয়ে তত কমই হয়। অথচ নৃবিজ্ঞানের পুরানা শিক্ষা হলো, কোনো সমাজকে চিনতে হলে তার ঘোষিত মূল্যবোধের দিকে না তাকিয়ে তাকাতে হয় তার বন্দোবস্তের দিকে।
মানুষ কীভাবে সঙ্গী খুঁজে নেয়, কে খুঁজে দেয়, খোঁজার অনুমতি কার লাগে।
এই প্রশ্নগুলির উত্তর গত এক দশকে বাংলাদেশে এমন নিঃশব্দে বদলে গেছে যে বদলটার কোনো নাম পর্যন্ত আমরা এখনো ঠিক করে উঠতে পারি নাই।
সংবাদমাধ্যমে বিষয়টা আসে হয় প্রতারণার খবর হয়ে, আর নাহয় অধঃপতনের আক্ষেপ হয়ে। হয়তো দুইটাই আংশিক সত্য এবং দুইটাই মূল ঘটনাটাকে আড়াল করে।
মূল ঘটনাটা হলো, সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষমতা এই সমাজে হাতবদল হচ্ছে, এবং ইতিহাসে ক্ষমতার অধিকাংশ হাতবদলের মতো এটাও ঘটছে কোনো ঘোষণা ছাড়াই।
যারা বলেন ‘ডেটিং অ্যাপ’ একটা আমদানি করা বিকৃতি, আমাদের সংস্কৃতিতে এসবের স্থান ছিল না, তারা সম্ভবত রবিবারের পত্রিকার পাত্রপাত্রী কলামের কথা ভুলে গেছেন, যেখানে মানুষের উচ্চতা, গাত্রবর্ণ, বেতন ও বংশমর্যাদা ছাপার অক্ষরে দরদামের টেবিলে উঠত এবং কারও শালীনতাবোধে আঘাত লাগত না।
পেশাদার ঘটকের ফি ছিল, সফল সম্বন্ধে তার প্রাপ্য বাঁধা ছিল, আর ড্রয়িংরুমে ড্রয়িংরুমে স্ট্যাপল করা ছবিসহ জীবনবৃত্তান্ত হাতবদল হতো।
সুতরাং বাছাই ছিল, শর্ত মেলানো ছিল, প্রত্যাখ্যান ছিল।
যেটা ছিল না, সেটা হলো এই সমস্ত কর্মকাণ্ডে যার জীবন নিয়ে কারবার, তার নিজের কোনো কার্যকর ভূমিকা। নির্বাচক ছিল পরিবার, ঘটক, কলাম ও আত্মীয়মণ্ডলী ছিল পরিবারেরই প্রতিনিধি।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যে রাখলে আজকের অনলাইন ম্যাট্রিমনি শিল্পকে চিনতে অসুবিধা হয় না।
এই শিল্পের সাফল্য প্রমাণ করে যে ঘটকালি মরে নাই, সে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ফুপুর অভিজ্ঞতালব্ধ বিবেচনার জায়গায় বসেছে ডেটাবেজের ফিল্টার।
এইখানে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি পার্থক্য লক্ষ করার মতো, ফুপুর পক্ষপাত পরিবারের সবাই জানত এবং দরকারে চ্যালেঞ্জ করা যেত।
অ্যালগরিদমের পক্ষপাত কোন যুক্তিতে কাকে কার সামনে হাজির করছে, সেই হিসাব ব্যবহারকারী দূরে থাক, অনেক সময় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিজেও পুরাপুরি জানে না।
তবে টিন্ডার, বাম্বলের মতো অ্যাপগুলি এই বংশলতিকারই পরের প্রজন্ম হয়েও একটা মৌলিক জায়গায় পূর্বসূরিদের থেকে আলাদা, এবং সেই জায়গাটাই সমাজতাত্ত্বিক বিবেচনায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।
সমাজবিজ্ঞানীরা যাকে এজেন্সি বলেন, নিজের জীবনের সিদ্ধান্তে নিজের কর্তৃত্ব, বাঙালি তরুণ-তরুণীর প্রেমজীবনে সেই বস্তুটা এই প্রথম কোনো মধ্যস্থতাকারীর অনুগ্রহ ছাড়া, খোদ প্রযুক্তির নকশার ভেতরে সরবরাহ হচ্ছে।
এবং এই সরবরাহের মাত্রাটা অনুমানের বিষয় না, মাপা হয়ে গেছে।
বাজার-গবেষণা সংস্থা স্ট্যাটিস্টার হিসাবে বাংলাদেশে অনলাইন ডেটিং সেবার ব্যবহারকারীর সংখ্যা টানা এগারো বছর ধরে বাড়ছে। তাদের পূর্বাভাস, এই দশকের শেষে সংখ্যাটা এক কোটি আটত্রিশ লাখে পৌঁছাবে।
বিশ্বজুড়ে এই সেবার ব্যবহারকারী এখন আনুমানিক আটত্রিশ কোটি। মার্কিন পিউ রিসার্চের জরিপে ত্রিশের কম বয়সীদের প্রতি পাঁচজনে একজন সঙ্গী পেয়েছেন অনলাইনে। অর্থাৎ পৃথিবীর একটা বড় অংশে এটা আর প্রান্তিক চর্চা না, সঙ্গী খোঁজার প্রধানতম পথগুলির একটা।
যে সমাজে বহু পরিবারে বিবাহপূর্ব সম্পর্ক এখনো শাস্তিযোগ্য বিবেচিত হয়, সেই সমাজ এই বৈশ্বিক স্রোতের বাইরে থাকে নাই। কোটির কাছাকাছি মানুষের পকেটে সঙ্গী-নির্বাচনের যন্ত্র ঢুকে পড়েছে। এবং এই ঢুকে পড়াটা কোনো সংস্কার আন্দোলনের ফসল না, কোনো আইনের ফসল না।
স্বীকার করতেই হয়, নতুন প্রজন্ম অনুমতির অপেক্ষায় থাকে নাই।
সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান মানুষের সামাজিক জীবনকে মঞ্চের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, সামনের মঞ্চে আমরা দর্শকের প্রত্যাশামাফিক অভিনয় করি, পেছনের ঘরে গিয়ে মুখোশ নামাই।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এই তত্ত্বের এমন এক জীবন্ত প্রদর্শনী দাঁড় করিয়েছে যে গফম্যান দেখলে কৃতার্থ হতেন।
একই মুঠোফোনে দুই মঞ্চ চলে, এক ফোল্ডারে ম্যাট্রিমনি অ্যাপ, যার প্রোফাইল মায়ের তত্ত্বাবধানে তৈরি এবং যেখানে ছবিটা পারিবারিক। আরেক ফোল্ডারে, প্রায়শই লুকানো ফোল্ডারে, ডেটিং অ্যাপ, যেখানে নামের অর্ধেকটা অনেক সময় উহ্য।
আর প্রোফাইলের নিচে লেখা, পরিচিত কেউ দেখে ফেললে উভয়পক্ষ নীরবতার চুক্তিতে আবদ্ধ।
দেশের সংবাদমাধ্যম যখনই এই ব্যবহারকারীদের সাক্ষাৎকার নিতে গেছে, একটা শর্ত অলঙ্ঘনীয় থেকেছে, ছদ্মনাম। ঢাকার যে তরুণ পত্রিকাকে জানাচ্ছেন কীভাবে টিন্ডারে নিবন্ধন করলেন, কী পেলেন, কী শিখলেন, তিনি ছাপার অক্ষরে ‘মিজান’, কারণ আসল নামটার দাম তার গোটা সামাজিক জীবন।
লাখ লাখ মানুষ একটা চর্চায় অংশ নিচ্ছে যেটার কথা তারা নিজের নামে বলতে পারে না। একটা পুরা প্রজন্ম দুই সমান্তরাল নৈতিক ব্যবস্থায় বসবাসের দক্ষতা অর্জন করেছে।
এই দ্বৈত বসবাসকে ভণ্ডামি বলে উড়িয়ে দেওয়ার আগে ভাবা দরকার, যে সমাজ সামনের মঞ্চ ছাড়া কিছু বরাদ্দই রাখে নাই, পেছনের ঘরটা সেখানে বিলাসিতা না, প্রয়োজন বলেই ধরতে হয়।
লক্ষণীয়, এই আড়ালের বাধ্যবাধকতা কিন্তু আইনের তৈরি না।
বাংলাদেশের কোনো আইনে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত মানুষের সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয় নাই, ডেটিং অ্যাপ নিষিদ্ধ হয় নাই। যা আছে তা আইন না, ভঙ্গি। হোটেল কর্তৃপক্ষকে অতিথিদের সম্পর্ক যাচাইয়ের নির্দেশনা, পার্কে টহল পুলিশের জেরা, বাড়িওয়ালার শর্তাবলি।
ফলে সম্পর্কচর্চা সরে গেছে সেইসব পরিসরে যেখানে কাবিননামা তলব করার কেউ নাই। এই সমাজে ডেটিংয়ের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটে স্ক্রিনের ভেতরে।
যেকোনো জমজমাট বাজারের আশপাশে যেমন আরও কিছু দোকান গড়ে ওঠে, এই বাজারের পাশেও উঠেছে। টেলিগ্রামে এসকর্ট ব্যবসা, ডেটিং অ্যাপে পরিচয়ের ফাঁদ পেতে ব্ল্যাকমেইলের চক্র, যাদের কয়েকটা গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরাও পড়েছে।
তবে এগুলিকে ডেটিং সংস্কৃতির ফসল ভাবলে ভুল হবে।
যৌনতার কেনাবেচা এই দেশে ইন্টারনেটের বহু আগে থেকে আছে, ধনী পুরুষের আশ্রয়ে থাকা সম্পর্কও নতুন কিছু না, প্রযুক্তি শুধু পুরানা ব্যবসার সাইনবোর্ড বদলে দিয়েছে।
আর ব্ল্যাকমেইলের চক্রগুলি দাঁড়িয়ে আছে একটামাত্র ভরসার উপর, শিকার লজ্জায় থানায় যাবে না। মানে প্রতারকের আসল পুঁজি প্রযুক্তি না, লজ্জা। লজ্জাটা বানিয়ে রেখেছে আমাদের চুপ থাকার সংস্কৃতি।
এই পাশের দোকানগুলি বাজারের অনিবার্য অংশ না, সেগুলি সরানো যায়। এবং সরানোটাই এখন দায়িত্ব। অভিযোগ নেওয়ার ভঙ্গি বদলাবে রাষ্ট্র, অ্যাপ নিরাপদ করবে নির্মাতা, আর লজ্জার বদলে মামলাটাকে স্বাভাবিক করব আমরা।
শহুরে তরুণদের একটা ক্রমে বাড়তে থাকা অংশের কাছে সম্পর্ক আর বিয়ের ওয়েটিংরুম না। নির্দিষ্ট মেয়াদের ঘনিষ্ঠতা, দায়হীন বন্ধন, এমনকি এক সন্ধ্যার সম্মতিও তাদের অভিধানে ঢুকে গেছে, এবং শব্দগুলি তারা অপরাধীর গলায় উচ্চারণ করে না।
মুরুব্বিদের কাছে এটাই অধঃপতনের শেষ প্রমাণ।
সমাজবিজ্ঞান এই প্রতিক্রিয়াটা চেনে, নৈতিক আতঙ্ক। কিন্তু আতঙ্কের চিৎকারে যে জিনিসটা শোনা যায় না তা হলো, এই নতুন চর্চার ভেতরে একটা নতুন ব্যাকরণ তৈরি হচ্ছে, সেটা সম্মতির ব্যাকরণ।
পুরানা বন্দোবস্তে ঘনিষ্ঠতার শর্ত নিয়ে কথা বলার কোনো ভাষাই ছিল না। নতুন বন্দোবস্তে শর্তের আলাপটা আগে আসে, কী চাই, কতটুকু, কোন সীমায়। ব্যবহারকারী তরুণীদের সাক্ষাৎকারে একটা কথা ঘুরেফিরে আসে, এখানে এসে প্রথমবার মনে হয়েছে সিদ্ধান্তটা নিজের।
ভুল হলে সেটাও নিজের, ঠিক হলে সেটাও।
জরিপও একই দিকে আঙুল তোলে। পিউয়ের হিসাবে অনলাইনে সঙ্গী পাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি তাদের মধ্যেই, প্রথাগত পথগুলি যাদের জন্য সবচেয়ে সরু। কমবয়সীরা, আর যৌন সংখ্যালঘুরা।
উপসংহারে বলব, একটা মধ্যবিত্ত পরিবারে সম্ভবত এই মুহূর্তে দুইটা সমান্তরাল খোঁজ চলছে। মা ম্যাট্রিমনি সাইটে ছেলের জন্য প্রোফাইল খুলে রেখেছেন, ছেলে জানে না।
অন্যদিকে ছেলে লুকানো ফোল্ডারের অ্যাপে নিজের খোঁজ চালাচ্ছে, মা জানেন না। একই ছাদ, একই সন্তান, একই উদ্দেশ্য, কেবল কর্তৃত্বের প্রশ্নে দুই খোঁজ দুই যুগের।
কোনো একদিন এই দুই খোঁজ মুখোমুখি হবে, প্রতিটা পরিবারেই হয়। সেই মুখোমুখিটা ঝগড়ায় গড়াবে না সমঝোতায়, তার উপরই নির্ভর করছে এই সমাজ তার সবচেয়ে বড় নীরব রূপান্তরটা কীভাবে হজম করবে।
তবে রূপান্তরটা আদৌ হবে কি না, সেই প্রশ্নের সময় পার হয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত ঘটে গেছে। বিতর্কটা কিছু দেরিতে পৌঁছাচ্ছে।
