ফ্রিল্যান্সারদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে এআই, কমছে আয়

বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত এবং অনানুষ্ঠানিক হিসাবে বছরে তাদের আয় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু এআইয়ের দ্রুত বিস্তারে এই বাজারের সবচেয়ে সহজ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো এখন সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। ফলে অনেক ফ্রিল্যান্সারের কাজ কমছে, কমছে আয়ও।
একসময় কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের সামনে বসেই বিদেশি ক্লায়েন্টের ছোট ছোট কাজ করে আয় করার সুযোগ বাংলাদেশের তরুণদের কাছে বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। ডেটা এন্ট্রি, অনুবাদ, ছবি সম্পাদনা, কনটেন্ট লেখা কিংবা সাধারণ ডিজাইনের মতো কাজ দিয়ে অনেকেই গড়ে তুলেছিলেন নিজের কর্মসংস্থান। কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। কারণ, যে কাজ করতে আগে একজন ফ্রিল্যান্সারের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন সেটি কয়েক মিনিটেই করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত এবং অনানুষ্ঠানিক হিসাবে বছরে তাদের আয় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু এআইয়ের দ্রুত বিস্তারে এই বাজারের সবচেয়ে সহজ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো এখন সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। ফলে অনেক ফ্রিল্যান্সারের কাজ কমছে, কমছে আয়ও।
দীর্ঘদিন ধরে ফ্রিল্যান্সিং করা এমরাজিনা ইসলামের অভিজ্ঞতাই এর একটি উদাহরণ। ২০১১ সাল থেকে কাজ করা এই ফ্রিল্যান্সারের একটি বড় বিদেশি ক্লায়েন্ট হারানোর পর আয় ৮০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। তাঁর টিমে একসময় ১৫ জন কাজ করলেও এআইয়ের কারণে গ্রাফিক ডিজাইন, ছবি সম্পাদনা ও প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনার মতো কাজের বড় অংশ এখন আর আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না।
শুধু ডিজাইন নয়, ফটোগ্রাফির বাজারেও একই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রায় দুই দশক ধরে এই পেশায় থাকা ইউসুফ তুষার জানান, এআই দিয়ে ছবি তৈরির সুযোগ বাড়ায় বাণিজ্যিক ও স্টক ফটোগ্রাফির চাহিদা কমেছে। তাঁর আয়ও প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।
আরেক ফ্রিল্যান্সার কাজী মামুনের কাজ কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে দীর্ঘদিনের সরাসরি ক্লায়েন্ট থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা সামলাতে পারছেন তিনি। তাঁর মতে, অনেক ফ্রিল্যান্সারের কাজ অর্ধেক বা তারও বেশি কমে গেছে। ছোটখাটো কাজের জন্য ক্লায়েন্টরা এখন আগের মতো ফ্রিল্যান্সার নিয়োগ করছেন না।
তবে এআইয়ের গল্পটা শুধু কাজ হারানোর নয়। বদলে যাচ্ছে কাজের ধরনও। অনলাইন কাজের বাজারে এআই-সংক্রান্ত দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে।
আপওয়ার্কের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের প্ল্যাটফর্মে এআই-সংক্রান্ত কাজ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ বেড়েছে ৫২ শতাংশ। এআই নিয়ে কাজ করা ফ্রিল্যান্সাররা সাধারণ কাজ করা কর্মীদের তুলনায় গড়ে ৪০ শতাংশের বেশি পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।
অর্থাৎ, এআই একদিকে পুরোনো কাজ সরিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে নতুন কাজের বাজারও তৈরি করছে। সমস্যাটা হচ্ছে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের বড় একটি অংশ এখনো এমন কাজের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলো এআই তুলনামূলক সহজে করতে পারে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুরের মতে, বৈশ্বিক সেবা খাত দ্রুত এআইনির্ভর হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে বাংলাদেশকে এখনই গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সিং ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান তানজিবা রহমানও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, দেশে এখনো যে ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তার বড় অংশই প্রাথমিক পর্যায়ের। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উচ্চতর দক্ষতার দিকে যেতে হবে।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা কত দ্রুত সাধারণ কাজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশেষায়িত, সৃজনশীল ও সিদ্ধান্তনির্ভর কাজে যেতে পারবেন, সেটিই এখন হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি থেমে থাকবে না। ফলে টিকে থাকার পথও একটাই, দক্ষতার পরিবর্তন।
